মোকলেচুর রহমান, দাকোপ,(খুলনা) প্রতিনিধি:
খুলনার উপকূলীয় অঞ্চল দাকোপ উপজেলার বটবুনিয়া এলাকার ওয়াপদা বেড়িবাঁধের ভাঙন আতঙ্ক পুরোপুরি দূর হওয়ার আগেই, নতুন করে ধস নেমেছে পানখালী ইউনিয়নের খলিশা এলাকায়। পোল্ডার এলাকার জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধের নিরাপত্তা যখন চরম হুমকির মুখে, তখন টেকসই ও স্থায়ী ব্যবস্থা না নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এমন নির্লিপ্ততা ও চরম অবহেলাকে দায়ী করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভাঙন যখন নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, কেবল তখনই টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। অন্যদিকে আপৎকালীন এই সংকটের ফায়দা লুটতে ও অনৈতিক লাভ খুঁজতে তৎপর হয়ে উঠছে একশ্রেণীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।সরেজমিনে জানা গেছে, বটবুনিয়া এলাকার ঢাকি নদীর তীরের ভাঙন রোধে কাজ শেষ হতে না হতেই পানখালীর খলিশা এলাকায় খোনা মোল্লা বাড়ির সামনের বাঁধে তীব্র ফাটল ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। দিনে দিনে এই ভাঙনের তীব্রতা বাড়ায় আশপাশের হাজারো পরিবার, বসতভিটা ও আমন ফসলের মাঠ নিয়ে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। প্রমত্তা নদীর তীব্র জোয়ার আর স্রোতের তোড়ে যেকোনো মুহূর্তে বাঁধটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে লোকালয়ে নোনাপানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বাঁধটিতে যখন প্রথম ফাটল দেখা দিয়েছিল, তখনই কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। যখন ভাঙন ভয়াবহ রূপ নেয় এবং নদীগর্ভে বাঁধের বড় অংশ বিলীন হতে শুরু করে, ঠিক তখনই কেবল পাউবো কিছু জিও ব্যাগ কিংবা সাময়িক ব্লক ফেলে দায় সারার চেষ্টা করে। স্থানীয়দের সোজা কথা, “আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে আজ এত বড় ক্ষতি হতো না। পাউবোর অবহেলার কারণেই প্রতিবছর আমাদের ঘরবাড়ি হারাতে হয়।”অভিযোগ উঠেছে, বাঁধের এই নিয়মিত ভাঙন ও সংস্কারের খেলাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের চেয়ে জরুরি ও আপৎকালীন কাজের নামে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ আনা ঠিকাদারদের জন্য বেশি লাভজনক। ভাঙন যত বড় হবে, বরাদ্দের অঙ্ক তত বাড়বে—এই সুযোগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো কাজ না করে ভাঙন চরম রূপ নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করে বলে স্থানীয়দের মনে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তড়িঘড়ি করে ফেলা বালুর বস্তা বা জিও ব্যাগ শক্তিশালী জোয়ারে টিকতে পারে না, যার ফলে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হলেও জনগণের দুর্ভোগ অপরিবর্তিতই থেকে যায়। তাছাড়া জিও ব্যাগগুলো পুরোপুরি বালু ভরাট না করে কোন মতে পেলে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
আমনের ফসল ও বসতভিটা রক্ষায় শঙ্কা: বর্তমান আমন মৌসুম চলায় খলিশা এলাকার কৃষকেরা মারাত্মক আতঙ্কে আছেন। বাঁধ ভাঙলে মাঠের ফসল লোনাপানিতে তলিয়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে। লোকালয়ে পানি প্রবেশ ঠেকাতে অতি দ্রুত স্থানীয়দের ও পাউবোর সমন্বয়ে টেকসই বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।বাঁধের তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি জানানো এবং সহায়তার জন্য জেলা কার্যালয় ও খুলনা পানি উন্নয়ন বিভাগ-১ ও ২ এর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা প্রয়োজন। যেকোনো প্রশাসনিক জরুরি প্রয়োজনে সরকারি সেবা নম্বর ৩৩৩ বা জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা যেতে পারে। দাকোপের পোল্ডার এলাকার মানুষকে বারবার ভিটেমাটি ছাড়া হওয়া থেকে বাঁচাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এই ঠুনকো সংস্কারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অনৈতিক মুনাফা বন্ধ করে খলিশা ও বটবুনিয়া অঞ্চলে অবিলম্বে স্থায়ী, টেকসই এবং সুউচ্চ সিসি ব্লক সম্বলিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করাই এখন দাকোপবাসীর একমাত্র প্রাণের দাবি।


