হাবিবুল হাসান হাবিব, ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি-
নীলফামারীর ডিমলায় এমপির পরিদর্শনের সময়ই ভেঙে পড়ল কাঠের সেতু। জরাজীর্ণ কাঠের সেতুর বেহাল অবস্থা পরিদর্শনে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন নীলফামারী-১ (ডোমার–ডিমলা) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার ও তাঁর সফরসঙ্গীরা। অতিরিক্ত মানুষের চাপে সেতুটির একটি অংশ হঠাৎ ভেঙে নদীতে পড়ে যান কয়েকজন নেতা-কর্মী। তবে অল্পের জন্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছেন সংসদ সদস্যসহ উপস্থিত অন্যরা। বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার নটাবাড়ী–নাউতারা সংযোগ সড়কের নাউতারা নদীর ওপর থাকা জরাজীর্ণ কাঠের সেতু পরিদর্শনে গেলে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা জানায়, নটাবাড়ী ও নাউতারা এলাকার মানুষের চলাচলের জন্য নাউতারা নদীর ওপর দীর্ঘদিন আগে নির্মাণ করা হয় কাঠের এই সেতু। সময়ের সঙ্গে সেতুটির কাঠ পচে গেছে এবং বিভিন্ন অংশ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। সেতুর বিভিন্ন স্থানে কাঠ ভেঙে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে বড় বড় ফাঁক। তারপরও বিকল্প নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে প্রতিদিন এই সেতু ব্যবহার করছেন দুই পাড়ের মানুষ। তবে তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও এর স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বাড়লে সেতুটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপার করতে হয়। এ অবস্থায় সেতুটির বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে সেখানে যান নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার। তাঁর সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সফরসঙ্গীরাও ছিলেন। পরিদর্শনের সময় সেতুটির ওপর একসঙ্গে বেশ কয়েকজন উঠে পড়েন। এ সময় অতিরিক্ত মানুষের চাপে হঠাৎ করে সেতুটির একটি অংশ বিকট শব্দে ভেঙে যায়। মুহূর্তের মধ্যে কয়েকজন নেতা-কর্মী সেতুর ভাঙা অংশসহ নদীতে পড়ে যান। এতে সেখানে আতঙ্ক ও হইচই শুরু হয়। তবে সৌভাগ্যক্রমে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। স্থানীয়রা দ্রুত এগিয়ে এসে নদীতে পড়ে যাওয়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তারও অল্পের জন্য দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান বলে স্থানীয়রা জানান। ঘটনার পর সেতুটির ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সরেজমিনে দেখা যায়, কাঠের তৈরি সেতুটির বিভিন্ন অংশ দীর্ঘদিনের ব্যবহারে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোথাও কাঠ পচে গেছে, কোথাও আবার ভেঙে গেছে সেতুর পাটাতন। সেতুর ওপর দিয়ে একসঙ্গে একাধিক মানুষ চলাচল করলেই এটি দুলতে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সেতুটির ওপর দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে তারা প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকেন। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও নারীদের পারাপারের সময় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বর্ষাকালে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন আমাদের চলাচল করতে হয়। কাঠগুলো অনেক আগেই পচে গেছে। একটু অসাবধান হলেই নদীতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আজ নেতাকর্মীরা সেতুর ওপর উঠতেই একটি অংশ ভেঙে পড়েছে। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে অনেক মানুষের প্রাণহানি হতে পারত।’ আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এখানে একটি পাকা সেতু নির্মাণের দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের ভাষ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া এবং জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের হাসপাতালে নেওয়াতেও দুর্ভোগ পোহাতে হয়। শুধু কাঠ পরিবর্তন করে কিংবা সাময়িক মেরামত করে এই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ সেতুটির কাঠামোই এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই দ্রুত একটি পাকা সেতু নির্মাণের দাবি তাদের। স্থানীয়রা আরও বলেন, নটাবাড়ী ও নাউতারা এলাকার মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই এলাকার মানুষের পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারাও এটি ব্যবহার করেন। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই সেতু দিয়ে নদী পার হন। ফলে সেতুটি পুরোপুরি ভেঙে গেলে শুধু যোগাযোগ বিচ্ছিন্নই হবে না, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। স্থানীয়দের দাবি, দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি অপসারণ করে সেখানে স্থায়ীভাবে একটি পাকা সেতু নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন সেতু নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ বিকল্প পারাপারের ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছেন তারা। এদিকে সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তারের পরিদর্শনের সময় সেতুর একটি অংশ ভেঙে পড়ার ঘটনা স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগকে সামনে নিয়ে এসেছে। তাদের মতে, ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সেতুটির প্রকৃত অবস্থা কতটা ভয়াবহ। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মজিবুর রহমান বলেন দীর্ঘদিনের পুরোনো ও জরার্জীন সেতু হওয়ার কারনেই এ দূর্ঘটনা ঘটেছে। তবে সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার সম্পূর্ণ সুস্থ ও নিরাপদে আছেন। পরে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার বলেন, আজকের এই ঘটনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হলো গ্রামের মানুষ কতটা কষ্ট করে যাতায়াত করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি অপসারণ এবং সেখানে একটি টেকসই পাকা সেতু নির্মাণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।


