শৈশবেই কাঁধে সংসারের ভার, তিন বছরের বোনের কাছে মারিয়াই যেন মা
প্রতিবেদকঃ
তালাত মাহামুদ
সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক অন্ধের দৃষ্টি পত্রিকা
জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় শৈশব। যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই-খাতা, খেলনা কিংবা প্রিয় কোনো পুতুল—সেই বয়সেই একটি কিশোরীকে নিতে হয়েছে জীবনের কঠিনতম দায়িত্ব। নিজের শৈশবকে পেছনে ফেলে ছোট বোনকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রামে নেমেছে মারিয়া।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি মানবিক বর্ণনা থেকে জানা যায়, মারিয়ার বাবা প্রায় দুই মাস আগে গলায় ফাঁস নিয়ে মারা যান। বাবার মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই পরিবারের ওপর নেমে আসে আরেক দুর্যোগ। কিছুদিন পর তার মা-ও সন্তানদের ছেড়ে চলে যান বলে ওই বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পরিবারের ছোট সদস্যদের দেখভালের বড় দায়িত্ব এসে পড়ে মারিয়ার ওপর।
মারিয়ার একটি ছোট বোনের বয়স প্রায় তিন বছর। আরও একটি বোন রয়েছে, যার বয়স আনুমানিক এক বছর। এলাকাবাসীর অনুরোধ ও বোঝানোর পর ছোট বোনটিকে কিছুদিনের জন্য মায়ের কাছে রাখা সম্ভব হলেও মারিয়ার বৃদ্ধ ও অসহায় দাদী এখন নাতনিদের কোনোভাবে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আর মারিয়া নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে ছোট বোনটির পাশে থাকার চেষ্টা করছে।
তিন বছরের শিশুটিকে প্রায় সবসময়ই মারিয়ার কাছে থাকতে হয়। তাকে খাওয়ানো, আদর করা, কোলে নেওয়া, ঘুম পাড়ানো—সবকিছুতেই মারিয়ার উপস্থিতি যেন অপরিহার্য। বয়সে সে বোন, কিন্তু দায়িত্বে যেন একজন মায়ের প্রতিচ্ছবি।
সম্প্রতি মারিয়ার সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় তার হাতে ছিল অল্প কিছু চিড়া। হয়তো সেটুকুই ছিল তাদের রাতের খাবারের সম্বল। অথচ সেই সামান্য খাবারের মধ্যেও ছোট বোনটি ছিল নিশ্চিন্ত। মারিয়ার কোলে মাথা রেখে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে ছিল শিশুটি।
দৃশ্যটি ছিল একই সঙ্গে হৃদয়বিদারক ও গভীরভাবে মানবিক। ছোট্ট বোনটির প্রতি মারিয়ার মমতা যেন মাতৃত্বের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি হয়ে ফুটে উঠেছিল। কিন্তু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর মুহূর্তে মারিয়ার চোখের জল আর অসহায় দৃষ্টি সেই দৃশ্যকে আরও ভারী করে তোলে। তার চোখে ছিল না কোনো অভিযোগের ভাষা; ছিল অজস্র প্রশ্ন, অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অদৃশ্য এক ভয়।
এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে—সব শিশুর শৈশব সুখের হয় না। কারও শৈশব কেটে যায় খেলাধুলা ও হাসি-আনন্দে, আবার কারও শৈশব হারিয়ে যায় অভাব, অনিশ্চয়তা ও দায়িত্বের ভারে। একটি মৃত্যু কখনো কখনো মুহূর্তের মধ্যেই একটি পরিবারের পুরো জীবনযাত্রা বদলে দিতে পারে।
মারিয়ার গল্প শুধু একটি পরিবারের অসহায়ত্বের গল্প নয়; এটি সমাজের দায়িত্ববোধ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। এমন শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব শুধু পরিবারের একার নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, সমাজের বিত্তবান মানুষ, মানবিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান—সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষ করে শিশুদের খাদ্য, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করা জরুরি। এত অল্প বয়সে একটি শিশুর ওপর সংসারের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া তার স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই মানবিক সহায়তার পাশাপাশি তাদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মারিয়ার কোলে ঘুমিয়ে থাকা ছোট বোনটির মুখে হয়তো পৃথিবীর কোনো দুশ্চিন্তা নেই। কিন্তু যে কিশোরী তাকে বুকের কাছে আগলে রেখেছে, তার চোখে রয়েছে আগামী দিনের হাজারো প্রশ্ন।
জীবন থেমে থাকে না—দুঃখ, মৃত্যু আর অভাবের মধ্য দিয়েও জীবন এগিয়ে চলে। কিন্তু মারিয়াদের মতো শিশুদের পথটি যেন এতটা কঠিন না হয়, সেটি নিশ্চিত করা আমাদের সবার সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব।
ফেসবুক থেকে সংগৃহীত বর্ণনার ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।


