HomeUncategorizedগাছ, পাখি এবং বইয়ের বন্ধু নাহিদ উজ্জামান 

গাছ, পাখি এবং বইয়ের বন্ধু নাহিদ উজ্জামান 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে শান্তি নিবিড় পাঠাগার। এই পাঠাগারটির প্রতিষ্ঠাতা ২৩ বছর বয়সী তরুণ নাহিদ উজ্জামান। জীবনে অনেক কষ্ট দুঃখ পার করে ও থেমে যায়নি এই তরুণের ব্যক্তির সামাজিক কাজ করার আনন্দ। মানুষকে বইমুখী করতে ২০২০ সালে ১৮ টি বই নিয়ে শুরু করেন পাঠাগারের কার্যক্রম। নিজেদের মুরগির খামার থেকে অর্জিত টাকা দিয়ে কেনেন বই। সেই সঙ্গে করেন বৃক্ষ রোপণও। সাথে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় করতে মাটির কলস ঝুলিয়ে দিচ্ছেন গাছে ।নাহিদ শিবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং শিবগঞ্জ ব্যবসায়ী ব্যবস্থাপনা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বর্তমানে কানসাট সোলেমান ডিগ্রি কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে নাহিদ ছোট। বাবা ব্যবসায়ী আর মা গৃহিণী।

একটু পেছনে ফিরে…

২০১৪ সালের কথা। নাহিদ গুরুতর সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বিছানায় পড়ে থাকেন। দীর্ঘ রোগভোগের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন ছোট্ট নাহিদ। তবে দিনমান মন খারাপ করে বসে থাকতেন। তখন বাবা অনুপ্রেরণা দেন, ভালো কাজে যুক্ত হওয়ার এবং তিনি নিজেও দেশের জন্য কাজ করার স্বপ্ন দেখতেন। সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। বাবার অনুপ্রেরণায় যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পান ছোট্ট নাহিদ। শুরু হয় তাঁর নতুন যাত্রা। বিনামূল্যে বই দেওয়া, এই যাত্রা যেন মানুষের কল্যাণেই।

 

অনুপ্রেরণায় যারা

বাবার অনুপ্রেরণার পাশাপাশি স্কুলের ছাত্র থাকা কালীন শিক্ষকদের ভালোবাসায়, পরিবেশ-প্রকৃতির ওপর নানা অনুপ্রেরণামূলক কথা শোনার পর নাহিদ শুরু করেন রাস্তার পাশে বৃক্ষরোপণের কাজ। শিক্ষক আর বাবার আদেশ অনুযায়ী, দরিদ্র শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কিনে দেন গাইড বই ও স্কুলব্যাগ,। ধীরে ধীরে তাঁর এই কার্যক্রম ছাড়িয়ে যায় নিজ জেলা। পর্যায়ক্রমে তিনি দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় শতাধিক শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষা উপকরণ পাঠাতে থাকেন। কেমন করে এসব উপকরণ পাঠান–জানতে চাইলে নাহিদ উজ্জামান বলেন, ‘কুরিয়ারের মাধ্যমে এসব শিক্ষা উপকরণ পাঠাই। তবে নিজ গ্রাম ও আশপাশের গ্রামে নিজে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসি। কখনও পরিচিত কাউকে পেলে তাঁর মাধ্যমেও পাঠানোর ব্যবস্থা করি।’

 

পাঠাগারের কার্যক্রম

নিজ গ্রাম এবং আশপাশের এলাকা গুলোতে উপহার দেওয়া থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত দশ হাজারেরও বেশি গাছের চারা রোপণ করেছেন নাহিদ। সমাজে একটি পাঠাগারের গুরুত্ব অপরিসীম বিষয়টি জানতে পেরে নিজ গ্রামে একটি পাঠাগার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে থাকেন নাহিদ । ১৮ টি বই নিয়ে ২০২০ সালে নিজ গ্রাম জালমাছমারির ইসরাইল মোড়ে শুরু করেন পাঠাগারের যাত্রা। বর্তমানে পাঠাগারটিতে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্যসহ ৭ হাজারেরও বেশি বই আছে। দৈনিক প্রায় পঞ্চাশ জন পাঠক এসে লাইব্রেরিতে বই পড়েন। নিবন্ধিত সদস্য আছে তিন শতাধিক। সদস্য ছাড়াও সকলে বসে বই পড়ার জন্য উন্মুক্ত। উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে পাঠক বই নিতে এলে খাতায় নাম-ঠিকানা উল্লেখ করে বইও নিতে পারেন। বেশি বই পড়ুয়া পাঠকদের দেন গাছের চারা উপহার। প্রতিমাসে আয়োজন করেন পাঠচক্রের। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে নিবন্ধিত পাঠাগারটি। সপ্তাহের সাত দিনই দুপুর ৩ টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে পাঠাগারটি।

 

অর্জন ও স্বীকৃতি

সামাজিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন নানান সংগঠন থেকে সম্মাননা। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাঁপাই ব্লাড ডোনেশনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সাদা মনের মানুষ হিসেবে গুণীজন সম্মাননা পেয়েছেন নাহিদ। নেলশন ম্যান্ডেলা শান্তি পুরস্কার, সর্বশেষ

মাদার তেরেসা স্বর্ণপদ ২০২৬

ও পেয়েছেন নাহিদ,

এ ছাড়াও জেলার বিভিন্ন সংগঠন থেকে সামাজিক কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন ।

 

আগামীর স্বপ্ন

 

নাহিদের বাবা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ছেলেকে বলেছিলাম মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মনুষ্যত্বের পরিচয় দিতে। আমার মুরগির খামারে কাজ করে সে। কাজের বিনিময়ে এবং নিজের আয়ের একটি অংশ সমাজসেবামূলক কাজে ব্যয় করতে দিয়ে ভালো কাজে যুক্ত থাকার জন্য সবসময় উৎসাহ দিই তাকে।’

 

শিবগঞ্জ কানসাট সোলেমান ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ আব্দুল হামিদ বলেন , ‘নাহিদ শিবগঞ্জ উপজেলার একজন আলোকিত মানুষ। সে বেচি মুরগি, কিনি বই-নামেও সুপরিচিত। উপজেলা প্রশাসনসহ সমাজের বিত্তবান মানুষরা তার পাশে থাকলে সে তার কাজে যেমন উৎসাহ পাবে, তেমনি তার পরিবেশ আন্দোলনও গতিশীল হবে।’

 

নিজের স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে নাহিদ উজ্জামান বলেন, ‘আমি বাবার দেওয়া পরামর্শে সবসময় ভালো কাজে যুক্ত থাকার চেষ্টা করি। যতদিন বেঁচে আছি ততদিন বই এবং গাছ, নিয়ে কাজ করে যেতে চাই। আল্লাহ যদি করাই তাহলে এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার স্বপ্ন আছে, তাহলে ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীরা বিনামূল্য শিক্ষা পাবে, পাঠাগারটিকে সমৃদ্ধিশালী পাঠাগারে রূপান্তরিত করার এবং দেশব্যাপী এই পাঠাগার কার্যক্রম ছড়িয়ে দিব।’

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments