হাবিবুল হাসান হাবিব, ডিমলা (নীলফামারী):
প্রতিনিধি- দীর্ঘদিনের অবহেলা ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা নদীর প্রবেশমুখে অবস্থিত বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ প্রতিরক্ষা বাঁধটি এখন নীরব বিপদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বাঁধটির বিভিন্ন স্থানে ধস, ক্ষয় ও দুর্বলতা স্পষ্ট হলেও কার্যকর সংস্কারের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় বর্ষা মৌসুম এলেই বেড়ে যায় তিস্তা তীরবর্তী মানুষের উদ্বেগ। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্র চাপ সৃষ্টি হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিতে পারে। এতে হাজারো মানুষের বসতভিটা, ফসলি জমি ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে ।বাংলাদেশে প্রবেশের আগে ভারতের সীমান্ত অতিক্রম করে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকা দিয়ে তিস্তা নদী দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। ভৌগোলিকভাবে এই প্রবেশমুখটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তিস্তা নদীর প্রস্থ তিন থেকে পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত, তবে নদীর প্রবল স্রোত প্রথম যে অংশ দিয়ে দেশে প্রবেশ করে, সেই কালীগঞ্জ অংশেই সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে নদী ব্যবস্থাপনা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এ স্থানটির গুরুত্ব অনেক বেশি। এই বাস্তবতা বিবেচনায় ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ উদ্যোগে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে। বাঁধটির মূল উদ্দেশ্য ছিল উজান থেকে নেমে আসা প্রবল স্রোত নিয়ন্ত্রণ করা, নদীর গতিপথ স্থিতিশীল রাখা এবং সীমান্তবর্তী এলাকার জনপদ, কৃষিজমি ও অবকাঠামোকে বন্যা ও ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করা। নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় ধরে বাঁধটি কার্যকর ভূমিকা পালন করলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সময়োপযোগী সংস্কারের অভাবে বর্তমানে এর বিভিন্ন অংশ মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, কালীগঞ্জ থেকে ছোটখাতা পর্যন্ত বাঁধের একাধিক স্থানে বড় ধরনের ক্ষয়, ধস ও ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও নদীর তীব্র স্রোতে বাঁধের ঢাল ভেঙে গেছে, আবার কোথাও জিওব্যাগ ও ব্লক সরে গিয়ে মাটির অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। বর্ষার পানি বাড়লেই এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে স্রোতের চাপ আরও বৃদ্ধি পায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর ধরেই বাঁধটির অবস্থা ক্রমাগত অবনতির দিকে গেলেও স্থায়ী সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ভারতের উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে এলে তিস্তার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তখন নদীর দুই তীরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয় এবং তীরবর্তী শত শত পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়ে। অনেক কৃষকের ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় রোপণ করা আমন ধান, ভুট্টা, সবজি ও অন্যান্য ফসল। নদীভাঙনের কারণে অনেক পরিবারকে বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছে। গত বছরও প্রবল স্রোতের চাপে যৌথ প্রতিরক্ষা বাঁধের কয়েকটি অংশ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে। জরুরি ভিত্তিতে কিছু স্থানে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হলেও তা ছিল সাময়িক ব্যবস্থা। স্থায়ী সংস্কার না হওয়ায় চলতি বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। কালীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দারা জানান, বর্ষা শুরু হলেই তাদের মধ্যে অজানা আতঙ্ক কাজ করে। রাতে নদীর পানি বাড়তে শুরু করলে অনেকেই ঘুমাতে পারেন না। কারণ, হঠাৎ বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তের মধ্যেই বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। অনেকেই বলেন, দুর্যোগের সময় সরকারি তৎপরতা দেখা গেলেও আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ খুবই সীমিত। স্থানীয় কৃষকরাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেলেই কৃষিজমি প্লাবিত হয়। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। অনেক পরিবার কৃষির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নদীভাঙন ও বন্যা তাদের জীবন-জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ অর্থবছরে যৌথ প্রতিরক্ষা বাঁধটির সংস্কারের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ ছিল না। ফলে প্রয়োজনীয় মেরামত ও পুনর্বাসনের কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে চলতি অর্থবছরে বাঁধটির ঝুঁকিপূর্ণ অংশ সংস্কারের জন্য নতুন করে অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, বরাদ্দ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো সংস্কারের কাজ শুরু করা যাবে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, বাঁধটির বিভিন্ন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছি। ২০২৫ অর্থবছরে এ খাতে কোনো বরাদ্দ ছিল না। তবে চলতি অর্থবছরে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের জন্য আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো সংস্কার করা হবে।তিনি আরও জানান, পুরো যৌথ প্রতিরক্ষা বাঁধটি টেকসইভাবে সংস্কার করতে প্রায় ৪০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। শুধু জরুরি মেরামত নয়, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রকৌশল পদ্ধতিতে বাঁধকে শক্তিশালী করাও জরুরি।
এদিকে নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মো. নায়িরুজ্জামান বলেন, যৌথ প্রতিরক্ষা বাঁধের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা চলছে। মানুষের জানমাল রক্ষায় যা যা প্রয়োজন, তা করা হবে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বলছেন, তিস্তা নদীর প্রবেশমুখে অবস্থিত এই বাঁধ শুধু ডিমলা উপজেলার জন্য নয়, পুরো উত্তরাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিলে নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষি, যোগাযোগ ও জনজীবনে ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে। শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অংশে মাটি ফেলে বা জিওব্যাগ বসিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদীর গতি প্রকৃতি, স্রোতের চাপ এবং পলি জমার ধরণ বিবেচনায় বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বাঁধ পুনর্নির্মাণ ও নদী ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেজিং, নদীতীর সংরক্ষণ এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
স্থানীয়দের দাবি, বরাদ্দের অপেক্ষায় সময়ক্ষেপণ না করে জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে স্থায়ী সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দ্রুত অনুমোদন দিয়ে কাজ শুরু করতে হবে। কারণ দুর্যোগ ঘটার পর ত্রাণ বা পুনর্বাসনের চেয়ে আগাম প্রতিরোধ অনেক বেশি কার্যকর ও ব্যয় সাশ্রয়ী।
তিস্তা তীরবর্তী মানুষের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে এবং বহু বছরের পুরোনো বাংলাদেশ ও ভারতের এই যৌথ প্রতিরক্ষা বাঁধকে টেকসইভাবে সংস্কার করবে। সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গেলে শুধু হাজারো মানুষের জীবন ও সম্পদই নয়, উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনও বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবে। অন্যথায়, চলতি বর্ষায় উজানের প্রবল ঢল নামলেই তিস্তার প্রবেশমুখে সৃষ্টি হতে পারে নতুন দুর্যোগ, যার মূল্য দিতে হবে নদীপাড়ের অসহায় মানুষদের।


