হাবিবুল হাসান হাবিব ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি-
নদী আছে, পারাপারের পথও আছে,কিন্তু নেই নিরাপদ যোগাযোগের ব্যবস্থা। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার নাউতারা নদীর ওপর স্থায়ী সেতু না থাকায় বছরের পর বছর ধরে জরাজীর্ণ কাঠের সাঁকোই ভরসা উপজেলার তিন ইউনিয়নের মানুষের। বেঁকে যাওয়া পাটাতন, ফাঁকা তক্তা আর নিরাপত্তাবেষ্টনীর অভাবে প্রতিদিনই বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। বিকল্প পথ না থাকায় শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অসুস্থ রোগীদেরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হচ্ছে নদী। দীর্ঘদিন ধরে সেতু নির্মাণের দাবি জানালেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
ডিমলার নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি গাছবাড়ি এলাকায় নাউতারা নদীর ওপর এই সাঁকোর অবস্থান। স্থানীয় উদ্যোগে নির্মিত সাঁকোটি নাউতারা, গয়াবাড়ী ও খালিশা চাপানী ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দীর্ঘদিন ব্যবহারে এর বিভিন্ন অংশ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। কোথাও পাটাতনের তক্তা বেঁকে গেছে, কোথাও তৈরি হয়েছে ফাঁক ও গর্ত। দুই পাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকায় সামান্য অসতর্কতাতেই নদীতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিকাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনে অসংখ্য মানুষ এই সাঁকো দিয়ে চলাচল করেন। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। জরুরি প্রয়োজনে রোগী নিয়ে যাতায়াত কিংবা নিত্যপ্রয়োজনে হাটবাজারে যাওয়ার ক্ষেত্রেও পোহাতে হয় দুর্ভোগ। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে থাকেন শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকেরা। ঐতিহ্যবাহী ছোটখাতা কামিল মাদ্রাসাসহ আশপাশের একাধিক মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই সাঁকো ব্যবহার করে যাতায়াত করতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ পাটাতন পেরিয়ে সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে দেখে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকেন অভিভাবকেরা।
স্থানীয় বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, নাউতারা নদীর ওপর সেতু না থাকায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। সাঁকোটির অবস্থা ভালো নয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে পারাপারের ভয় আরও বেড়ে যায়। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছি।
হাছেন আলী বলেন, “শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অসুস্থ রোগী—সবাইকে এই সাঁকো দিয়ে নদী পার হতে হয়। সন্তানদের স্কুল-মাদ্রাসায় পাঠিয়ে অভিভাবকেরা দুশ্চিন্তায় থাকেন। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই এখানে সেতু নির্মাণ করা জরুরি। শুধু যাতায়াত নয়, সেতুর অভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যও। তিন ইউনিয়নের অনেক কৃষক ধান, ভুট্টা, পাট ও শাকসবজিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য গাছবাড়ি, নাউতারা হাট, নতুন বাজার ও শুটিবাড়ি হাটে নিয়ে যেতে এই পথ ব্যবহার করেন। ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোর কারণে পণ্য পরিবহনে বাড়তি সময় ও খরচের মুখে পড়তে হয় তাঁদের। এতে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণেও ভোগান্তি বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বুলবুল আহমেদ বলেন, এই পথে তিন ইউনিয়নের মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে চলাচল করেন। কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজেও সাঁকোটি ব্যবহার করতে হয়। স্থায়ী সেতু নির্মাণ হলে মানুষের দুর্ভোগ কমবে, যোগাযোগব্যবস্থাও সহজ হবে।
নাউতারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আশিক ইমতিয়াজ মোর্শেদ বলেন, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আঞ্চলিক যোগাযোগপথ। আমার উদ্যোগে নির্মিত সাঁকোটি এখন প্রায় অচল। এখানে বহু আগেই একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ হওয়া উচিত ছিল।
ডিমলা উপজেলা প্রকৌশলী মো. মফিজুর রহমান জানান, তিনি স্থানটি পরিদর্শন করেছেন। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ প্রয়োজন। বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, সেতুটির গুরুত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা চলছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর দাবি জানালেও এখনো সেতু নির্মাণের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোই তাঁদের একমাত্র ভরসা হয়ে আছে। তাঁদের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়—দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে স্থায়ী সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করতে হবে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, বড় কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির অপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নাউতারা নদীর ওপর স্থায়ী সেতু নির্মাণে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। একটি সেতু নির্মিত হলে তিন ইউনিয়নের মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার পথ খুলবে।


