HomeUncategorizedঠিকাদার-যুবদল-কর্মকর্তাদের যোগসাজশে খাল পুনর্খননে ‘সাগর চুরি’

ঠিকাদার-যুবদল-কর্মকর্তাদের যোগসাজশে খাল পুনর্খননে ‘সাগর চুরি’

কোটি টাকার প্রকল্প ১০ লাখে সম্পন্ন, প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না করার অভিযোগ

হাবিবুর রহমান
রামগতি-কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধঃ

লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে খাল পুনর্খনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঠিকাদার, স্থানীয় যুবদল নেতা ও কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে উপজেলার জারিরদোনা শাখা খাল পুনর্খননে এমন অনিয়ম করা হয়েছে।
অভিযোগ ওঠেছে, এ খাল পুনর্খনন প্রকল্পটিতে প্রায় এক কোটি চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও মাত্র ১০ লাখ টাকা চুক্তিতে এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে কাজটি সম্পন্ন করা হয়। এক্ষেত্রে মানা হয়নি প্রকল্পের প্রাক্কলনের কোনো শর্ত। যে কারণে স্থানীয় এলাকাবাসীর ভাষ্য, এ খাল পুনর্খনন প্রকল্পে পুকুর নয়, যেন সাগর চুরি হয়েছে।

উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে সারাদেশে পুকুর ও খাল উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর আওতায় কমলনগর উপজেলার জারিরদোনা শাখা খালের হাজিরহাট মেঘনা সিনেমা হল প্রান্ত থেকে দক্ষিণ দিকে পাঁচ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার পুনর্খনেনর জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ‘মেসার্স নীলিমা ট্রেডার্স’ নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক কোটি তিন লাখ ৯৬ হাজার টাকায় প্রকল্পটির কার্যাদেশ পায়। কার্যাদেশে খালটির উপর অংশে ১৫ মিটার ও নিচের অংশে দুই দশমিক ৫মিটার প্রস্থ এবং খালটির গভীরে ১০ মিটার খনন করার পাশাপাশি ১৩টি স্পটে রেফারেন্স বেড ব্লক ও ২৬টি টিবিএম নির্মাণের কথা উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, প্রাক্কলন অনুযায়ী খালের গভীরতা ও প্রশস্ততা নিশ্চিত করা হয়নি। কোথাও খালের পরিবর্তে নালার মতো মাটি কেটে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হওয়ার এলাকাবাসীর যে প্রত্যাশা ছিল তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। তাছাড়া খাল পুনর্খননের প্রস্থ ও গভীরতা নিশ্চিতকরণ ও শনাক্তকরণের লক্ষে ১৩টি স্পটে রেফারেন্স বেড ব্লক ও ২৬টি টিবিএম নির্মাণের কথা থাকলেও সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই।

স্থানীয়রা জানান, স্থানীয় যুবদলের কয়েকজন নেতা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স নীলিমা ট্রেডার্স’র সত্ত্বাধিকারী রামগতি পৌর বিএনপির সহ-সভাপতি অপরূপ দাস থেকে ২৩ লাখ টাকা দিয়ে কাজটি কিনে নেন। এর পর তারা এক্সক্যাভেটর (ভেকু) মালিকের সঙ্গে ১০ লাখ টাকা চুক্তির মাধ্যমে কাজটি নামে মাত্র সম্পন্ন করেন। এক্ষেত্রে প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী মোট কাজের অন্তত ৩০ শতাংশ শ্রমিক ব্যবহার করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কোনো শ্রমিক ব্যবহার করা হয় নাই। এছাড়া খালের দুই পাড়ে গড়ে ওঠা দোকানপাট ও স্থাপনা অপসারণ না করে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে মাঝখান থেকে সীমিত পরিসরে মাটি কেটে খনন কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
তাদের অভিযোগ, প্রকল্পের নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী খালের গভীরতা ও প্রস্থ বজায় রাখা হয়নি। ফলে পর্যাপ্ত মাটি দুই পাড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। এতে খালের গাইডওয়াল ধসে পড়ছে এবং পাড়সংলগ্ন সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন খাল খনন প্রকল্পটি যেন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়। এলাকাবাসী যেন এর সুফল ভোগ করতে পারেন। তাই তারা কোটি টাকার এ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্ত দাবি করেছেন। পাশাপাশি এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতিকারীদের বিরুদ্ধে যেন যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয় সে দাবিও করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেন বলেন, এটি একটি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প। কিন্তু দায়সারাভাবে কাজ করে প্রকল্পটির অধিকাংশ অর্থ লোপাট করা হয়েছে। এ যেন সাগর চুরি। ঠিকাদার ও যুবদলের নেতারা অফিসারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এমনটি করেছেন। তাই পুরো বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।
পাটারীরহাট ইউনিয়ন বিএনপিার সদস্য শঙ্কর মজুমদার বলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে এলাকাবাসী সুফল পাওয়ার কথা থাকলেও উল্টোটা হয়েছে। কাজের অনিয়মের কারণে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
জানতে চাইলে হাজিরহাট ইউনিয়ন যুবদল নেতা মো. শরীফুল ইসলাম জানান, নীলিমা ট্রেডার্স থেকে নিয়ে তারা কয়েকজন মিলে কাজটি করেছেন। প্রকল্পের কার্যাদেশ অনুযায়ীই এটি সম্পন্ন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম করা হয়নি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স নীলিমা ট্রেডার্স’র সত্ত্বাধিকারী রামগতি পৌর বিএনপির সহ-সভাপতি অপরূপ দাস বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। এর বেশি কিছু জানতে হলে আপনারা এলজিইডির ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে দেখা করেন।

প্রকল্পটির তদারকি কর্মকর্তা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী ছিদ্দিকী প্রকল্পে কোনো শ্রমিক ব্যবহার না করার কথা স্বীকার করে বলেন, ভেকু মেশিন দিয়ে হলেওতো কাজ করা হয়েছে। আমি কাজটি পরিদর্শনের জন্য তিনি দুইদিন গিয়েছি। তখন অন্য সব কিছু ঠিক পেয়েছি। ইতোমধ্যে প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উত্তোলন করে নিয়েছেন। তবে, রেফারেন্স বেড ব্লক ও টিবিএম নির্মাণের অস্তিত্ব না থাকার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি।
এব্যাপারে বক্তব্য নেওয়ার জন্য উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল কাদের মোজাহিদের মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তিনি বলেন, অসুস্থ ছেলের চিকিৎসার জন্য তিনি হাসপাতালে রয়েছেন। এব্যাপারে তিনি পরে কথা বলবেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments