হাবিবুল হাসান হাবিব, ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি- নীলফামারীর ডিমলায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘জুলাই শহীদ দিবস ২০২৬ পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা, শহীদদের স্মরণ, তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং জুলাই আন্দোলনে আহত ও নির্যাতিত সহযোদ্ধাদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পুনর্বাসনের দাবিতে ছিল আবেগঘন পরিবেশ। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, প্রশাসনের কর্মকর্তা, ছাত্র-জনতার প্রতিনিধি, জুলাই আন্দোলনের সহযোদ্ধা, সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা জুলাই বিপ্লবের বীর শহীদদের আত্মত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনে তাঁদের আদর্শকে ধারণ করার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রওশন কবির, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না এবং ডিমলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শওকত আলী সরকার। এছাড়া আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নীলফামারী জেলা শাখার উপদেষ্টা অধ্যাপক রইসুল আলম চৌধুরী, জেলা বিএনপির সদস্য অধ্যাপিকা সেতারা সুলতানা ও গোলাম রব্বানী প্রধান, ডিমলা উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি আরিফুল ইসলাম লিটন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডিমলা উপজেলা শাখার আমির মাওলানা মজিবুর রহমান, এনসিপির জেলা সদস্য রাশেদুজ্জামান রাশেদসহ জুলাই বিপ্লবের সহযোদ্ধা এবং ছাত্র-জনতার প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানের শুরুতেই জুলাই আন্দোলনে শহীদ হওয়া বীর সন্তানদের স্মরণে গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে আন্দোলনে আহত, পঙ্গুত্ববরণকারী এবং নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের দ্রুত সুস্থতা ও কল্যাণ কামনা করা হয়। আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের আত্মত্যাগ জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের। বক্তারা আরও বলেন, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো নীলফামারীর ডিমলা উপজেলাতেও অসংখ্য ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। অনেকেই গুরুতর আহত হয়েছেন, কেউ কেউ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের অবদান কোনোভাবেই বিস্মৃত হওয়ার নয়। রাষ্ট্রের উচিত তাঁদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং সরকারি স্বীকৃতির আওতায় নিয়ে আসা। আলোচনা সভা থেকে বক্তারা জোর দাবি জানিয়ে বলেন, ডিমলা উপজেলার জুলাই আন্দোলনে আহত ও নির্যাতিত সহযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা দ্রুত প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে তাঁদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পুনর্বাসন, আর্থিক সহায়তা এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।বক্তারা আরও বলেন, শুধু জাতীয় পর্যায়ের নয়, স্থানীয় পর্যায়ের ত্যাগী
আন্দোলনকারীদেরও যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন। ২৪ জুলাইয়ে যারা জীবনবাজি রেখে রাজপথে নেমেছিলেন, তাঁদের সংগ্রাম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে। ইতিহাস সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মকে মুক্তিকামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা জরুরি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত জুলাই বিপ্লবের সহযোদ্ধা ও ছাত্র-জনতার প্রতিনিধিরা তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। আন্দোলনের সময়কার নানা স্মৃতিচারণ করে তাঁরা বলেন, গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে দেশের মানুষ যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আহত ও নির্যাতিত সহযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব বলেও তাঁরা মন্তব্য করেন। আলোচনা সভায় উপস্থিত রাজনৈতিক নেতারাও দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তাঁরা বলেন, শহীদদের রক্তের ঋণ কখনো শোধ হওয়ার নয়। তবে তাঁদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার মধ্য দিয়েই সেই আত্মত্যাগের প্রকৃত সম্মান জানানো সম্ভব।অনুষ্ঠানে উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় সাংবাদিক, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। আলোচনা সভা জুড়ে ছিল আবেগঘন পরিবেশ। বক্তাদের বক্তব্যে উঠে আসে দেশপ্রেম, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। সমাপনী বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আত্মত্যাগ জাতির জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁদের স্মৃতি ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, আহত ও নির্যাতিত সহযোদ্ধাদের বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, তালিকা প্রণয়ন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানোর ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসন আন্তরিকভাবে কাজ করবে। তিনি আরও বলেন, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যায়কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে। শহীদদের আত্মত্যাগ, আহতদের কষ্ট এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ইতিহাস সংরক্ষণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রশাসন সব সময় জনগণের পাশে থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবে। ডিমলা উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচি স্থানীয় পর্যায়ে জুলাই শহীদ দিবস পালনের অন্যতম বৃহৎ আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ছাত্র-জনতা, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের সম্মিলিত উপস্থিতি দিবসটির গুরুত্বকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
ডিমলায় জুলাই শহীদ দিবস পালিত, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আহত সহযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি
RELATED ARTICLES


