HomeUncategorized১৩ বছর পর দেশে ফিরলেন, তবে নিথর দেহে

১৩ বছর পর দেশে ফিরলেন, তবে নিথর দেহে

আবছার খাঁন জয় টেকনাফ প্রতিনিধি।।

 

মালয়েশিয়ায় নির্মাণকাজ করতে গিয়ে প্রাণ গেল সেন্ট মার্টিনের তারেকের। ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৩ সালে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন সেন্ট মার্টিনের তারেক রহমান। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করে গত ১৩ বছর ধরে নিয়মিত দেশে টাকা পাঠিয়েছেন। স্বপ্ন ছিল আরও কয়েক বছর প্রবাসে থেকে দেশে ফিরে নিজেই একজন উদ্যোক্তা হবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। মালয়েশিয়ায় বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ করতে গিয়ে তিনতলা থেকে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।

 

গত ১৯ আগস্ট মালয়েশিয়ায় কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় তারেকের মৃত্যু হয়। পরে বুধবার রাতে বিমানযোগে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে আনা হয়। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে ঢাকার একটি হিমায়িত লাশ পরিবহনকারী অ্যাম্বুল্যান্সে করে মরদেহ নেওয়া হয় কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাটে। সেখান থেকে ট্রলারে করে বিকেলে তাঁর মরদেহ পৌঁছে সেন্ট মার্টিনের গ্রামের বাড়িতে।

 

মরদেহ সেন্ট মার্টিনে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে জেটিঘাটে ভিড় করেন শত শত মানুষ। স্বজন ও গ্রামের মানুষ শেষবারের মতো তারেককে দেখতে ছুটে আসেন। মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার পর স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।

 

সন্ধ্যায় সেন্ট মার্টিন জেটিঘাটসংলগ্ন সমুদ্রসৈকতে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তারেকের দাফন সম্পন্ন হয়।

 

তারেকের জেঠাতো ভাই আল ছাবের বলেন, ‘দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় ছিলেন তারেক। বিভিন্ন সময়ে ফোনে কথা হলে বলতেন, এতদিনে দেশের জন্য খুব মায়া হচ্ছে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও গ্রামের প্রকৃতি তাঁকে টানত। একবার পরিবার নিয়ে দেশে ফিরে ঘুরে যাওয়ার ইচ্ছার কথাও বলেছিলেন।’

 

তিনি বলেন, ‘তারেক দেশে ফিরেছেন, নিজের জন্মভূমি সেন্ট মার্টিনের মাটিতেও ফিরেছেন। তবে ফিরেছেন প্রাণহীন নিথর দেহ হয়ে। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার ও পুরো গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।’

 

স্বজনেরা জানান, তারেক সেন্ট মার্টিনের এক নারীকে বিয়ে করেন। পরে স্ত্রীকে ভিসার মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যান। তাঁদের সংসারে তিন বছর ও ছয় মাস বয়সী দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তারেকের মরদেহের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানও বিমানে বাংলাদেশে আসেন। স্বামী ও বাবার মরদেহের পাশে বসেই ট্রলারে করে তাঁরা সেন্ট মার্টিনে পৌঁছান।

 

পরিবারের সদস্যরা জানান, তারেকের মরদেহ দেশে আনতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস ও বাংলাদেশ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন তাঁরা। সরকারের আন্তরিক উদ্যোগের কারণে দ্রুত সময়ের মধ্যে মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তাঁরা।

 

সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুর রহমান বলেন, ‘তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। সেখানে দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মরদেহ দেশে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

 

বিদেশে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

 

তারেকের আকস্মিক মৃত্যুর পর বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নির্মাণশ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

 

মালয়েশিয়াপ্রবাসী জামাল হোসাইন বলেন, মালয়েশিয়া সরকার ও স্থানীয় ঠিকাদার সরাসরি যুক্ত থাকা বড় নির্মাণকাজগুলোতে সাধারণত শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের নাগরিকদের সাব-ঠিকাদার, তদারককারী বা ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায় না।

 

তাঁর ভাষ্য, দায়িত্বশীলদের উদাসীনতার কারণে অনেক শ্রমিক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হন। ফলে প্রবাসে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

 

১৩ বছর প্রবাসজীবনের পর তারেক ফিরলেন নিজের জন্মভূমিতে। তবে যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি বিদেশে গিয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই থেমে গেল তাঁর জীবন। রেখে গেলেন স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তানসহ শোকাহত পরিবার এবং সেন্ট মার্টিনের মানুষের জন্য এক গভীর শূন্যতা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments