হাবিবুল হাসান হাবিব, ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি-
নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। বিস্তীর্ণ বালুচরের বুকজুড়ে ফুটে আছে সারি সারি কাশফুল। মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে স্বচ্ছ পানির সরু জলধারা। বাতাসে দুলছে কাশফুলের সাদা শীষ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, ধূসর বালুচরে কেউ বিছিয়ে দিয়েছে শুভ্রতার চাদর। শরতের এমন রূপ দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সীমান্তবর্তী তিস্তা নদীর চরে প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে এই অপরূপ দৃশ্য। বিকেল নামলেই বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের আনাগোনা। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে আসছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে কাটাচ্ছেন অবসর। আবার কেউ মুঠোফোনের ক্যামেরায় ধরে রাখছেন শরতের শুভ্র সৌন্দর্য। উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন তিস্তার চরে গিয়ে দেখা যায়, কাশফুল দেখতে মানুষের ভিড়। ছোট একটি জলাধার পেরিয়ে সামনে এগোলেই চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ কাশবন। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ফুটেছে কাশফুল। কোথাও থোকায় থোকায়, কোথাও আবার গুচ্ছবদ্ধ সাদা ফুল বাতাসের সঙ্গে দুলছে। চারপাশের নির্জনতা আর জলধারার স্বচ্ছতা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে মনোরম পরিবেশ। কাশবনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলধারাটি অনেকটা ছোট লেকের মতো। সেখানে ছোট ডিঙি নৌকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেউ কেউ। শিশুরা মেতে উঠছে খেলায়, আর বড়রা ব্যস্ত ছবি তোলা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগে। নদীর চরের এই নির্জন পরিবেশে কিছুটা সময় কাটিয়ে ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ভুলতে চাইছেন দর্শনার্থীরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তিস্তায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর বিভিন্ন স্থানে বিস্তীর্ণ বালুচর জেগে উঠেছে। এসব চরের একাংশে গত কয়েক বছর ধরে কাশফুল ফুটতে দেখা যাচ্ছে। ভাদ্র মাসের শেষদিকে ফুল ফুটতে শুরু করে, থাকে কার্তিক মাস পর্যন্ত। বিকেল হলে স্থানীয় লোকজনও এখানে আসেন। জমে ওঠে আড্ডা, চলে গল্প আর খোশগল্প।
গয়াবাড়ি ইউনিয়নের শুটিবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হামিদ মিয়া মেয়েকে নিয়ে এসেছেন কাশবনে। তিনি বলেন, জায়গাটি সত্যিই অনেক সুন্দর। চারদিকে সাদা কাশফুল, মাঝখানে স্বচ্ছ পানির জলধারা। সব মিলিয়ে অসাধারণ দৃশ্য। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে মেয়েকে নিয়ে এসেছি। সন্ধ্যা হয়ে গেলেও সে বাড়ি ফিরতে চাইছে না।
১৩ বছর বয়সী প্রীতমের আবদার ছিল বাবার কাছ থেকে কাশফুল নেওয়া। বাবা মাহবুবার রহমান ফুল তুলে দিতেই খুশিতে আত্মহারা হয় সে। মাহবুবার রহমান বলেন, এমনিতেই তিস্তার তীরের পরিবেশ মুগ্ধ করার মতো। তার ওপর একসঙ্গে এত কাশফুল দেখে মনটা শান্ত হয়ে যায়। ভালো লাগে বলেই পরিবার নিয়ে প্রায়ই এখানে আসি।
কালিরডাঙ্গা এলাকা থেকে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে এসেছেন ফরিদ আহমেদ। তিনি বলেন, শহরে পরিবার নিয়ে ঘোরার মতো জায়গা খুব বেশি নেই। তাই চিরচেনা কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে তিস্তার চরে এসেছি। এখানে এসে পরিবারের সঙ্গে ভালো সময় কাটানো যায়।
পশ্চিম খড়িবাড়ি গ্রামের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হেলাল উদ্দিনের কাছেও জায়গাটির সৌন্দর্য প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মনে হয়েছে। তিনি বলেন, যেমনটি ভেবেছিলাম, এসে দেখি তার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর। অনেক দূর পর্যন্ত কাশফুল ছড়িয়ে আছে। আশপাশে দু-একটি খাবারের দোকান থাকলে জায়গাটি ঘিরে গ্রামীণ মেলার মতো পরিবেশ তৈরি হতে পারত।
মতির বাজার এলাকার বাসিন্দা হাফিজুর রহমান জানান, গত এক-দুই বছর ধরে এখানে কাশফুল দেখতে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। বিকেল হলেই অনেকে আসেন ছবি তুলতে ও সময় কাটাতে। ছুটির দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বাড়ে।
নাউতারা এলাকা থেকে ঘুরতে আসা দুই তরুণ-তরুণীর কাছে তিস্তার চরে আসার মূল আকর্ষণ কাশফুল। তাঁদের ভাষ্য, একসঙ্গে এত কাশফুল আগে কখনো দেখেননি। কাশবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে অনেক ছবি তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের কাছে বিকেলটি হয়ে উঠেছে স্মরণীয়। বিকেলের সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় দৃশ্যপট। নরম আলোয় সাদা কাশফুল, বিস্তীর্ণ বালুচর আর স্বচ্ছ জলধারা মিলে তৈরি করে এক মায়াবী আবহ। প্রকৃতির এই আয়োজন দেখতে ডিমলা ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসছেন মানুষ। তিস্তার এই চর শুধু কাশফুলের সৌন্দর্যেই দর্শনার্থীদের টানছে না, হয়ে উঠছে পরিবার-পরিজন নিয়ে কিছুটা সময় কাটানোরও এক আকর্ষণীয় স্থান। নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচরে শরতের এই শুভ্রতা যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে নতুন করে তুলে ধরছে বাংলার চিরচেনা সৌন্দর্য।


